আপনার পড়ার টেবিলটা যখন খুব অগোছালো থাকে, বই-খাতা সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, তখন কি সেখানে বসে পড়াশোনায় মন দেওয়া সহজ হয়? সম্ভবত না। আমাদের ডিজিটাল জীবনটাও কিন্তু অনেকটা সেই পড়ার টেবিলের মতোই। যখন ফোনে হাজারটা নোটিফিকেশন, ল্যাপটপে অগুনতি ট্যাব খোলা, আর মাথায় অ্যাসাইনমেন্টের ডেডলাইনের চিন্তা ঘুরপাক খায়—তখন ফোকাস ধরে রাখা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে। একজন লাইফস্টাইল বা ইন্টেরিয়র স্টাইলিস্ট যেমন ছোট একটা ঘরকে গুছিয়ে ছিমছাম আর সুন্দর করে তোলেন, ঠিক তেমনই আমাদের ডিজিটাল স্পেস বা পড়াশোনার জগতটাকেও একটু গুছিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
আজকের এই লেখাটি মূলত সেই গোছানোর গল্প নিয়ে। আমরা কথা বলব এমন কিছু টুলস নিয়ে, যেগুলো আপনার ছাত্রজীবনের বিশৃঙ্খলা কমিয়ে এনে সেখানে একটা শান্তির আমেজ তৈরি করতে পারে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার এড়িয়ে চলা অসম্ভব, তবে সেটা হতে হবে পরিমিত এবং কার্যকর। অনেকেই আজকাল সেরা ফ্রি এআই টুলস খুঁজছেন যা পড়াশোনার চাপ কমাতে পারে। তবে সব অ্যাপই সবার জন্য নয়। আমি চেষ্টা করেছি এমন কিছু অ্যাপের কথা বলতে, যেগুলো ব্যবহার করা সহজ এবং সত্যিই কাজে আসে। আসুন, ডিজিটাল দুনিয়ার এই জটগুলো খুলে ফেলি এবং দেখি কীভাবে প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা আমাদের দিনটাকে আরেকটু সুন্দর করে সাজাতে পারি।
Productivity Apps for Students: কেন এগুলো এখন জরুরি?
একসময় পড়াশোনা মানেই ছিল খাতা-কলম আর ভারী বইয়ের ব্যাগ। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। ক্লাসের লেকচার থেকে শুরু করে গ্রুপ স্টাডি—সবই এখন প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু সমস্যা হলো, যেই ডিভাইস দিয়ে আমরা পড়ি, সেই ডিভাইসেই আবার বিনোদনের হাজারো হাতছানি। এই বিভ্রান্তি কাটানোর জন্যই প্রোডাক্টিভিটি অ্যাপের প্রয়োজন।
এগুলো কেবল কাজের গতি বাড়ায় না, বরং মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে। আপনি যখন জানবেন আপনার সব নোটস ঠিক জায়গায় আছে, কিংবা ক্যালেন্ডারে আগামীকালের সব কাজ সাজানো আছে, তখন এমনিতেই মনের ভেতর একটা স্বস্তি কাজ করে। এটি অনেকটা ঘরের আসবাবপত্র ঠিকঠাক জায়গায় রাখার মতো, যাতে হাঁটাচলার জায়গা বাড়ে।
শিক্ষার্থীদের জন্য প্রোডাক্টিভিটি অ্যাপস: আমার বাছাই করা তালিকা
এখানে আমি যে ১০টি অ্যাপের কথা বলব, সেগুলো আমি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছি। নোট নেওয়া, সময় ব্যবস্থাপনা বা ফোকাস বাড়ানো—সবকিছুর জন্যই আলাদা আলাদা সমাধান রয়েছে।
১. শিক্ষার্থীদের জন্য নোশন (Notion) ব্যবহারের নিয়ম
নোশন (Notion) এখনকার শিক্ষার্থীদের কাছে বেশ পরিচিত নাম। তবে শুরুতে এটি ব্যবহার করতে গিয়ে অনেকেই একটু ঘাবড়ে যান। কারণ এটি অনেকটা ফাঁকা ক্যানভাসের মতো—আপনি যেভাবে চাইবেন, সেভাবেই একে সাজাতে পারবেন।
নোশনকে আপনি আপনার ডিজিটাল বাইন্ডার বা ডায়েরি হিসেবে ভাবতে পারেন। এখানে আপনি ক্লাস রুটিন, অ্যাসাইনমেন্ট ট্র্যাকার, এমনকি আপনার ব্যক্তিগত জার্নালও রাখতে পারেন।
-
শুরুটা যেভাবে করবেন: প্রথমে খুব জটিল টেমপ্লেট ব্যবহার করার দরকার নেই। সাধারণ একটি ‘টু-ডু লিস্ট’ বা ক্লাসের নোট নেওয়ার পেজ দিয়ে শুরু করুন।
-
কেন এটি সেরা: নোশনের সবচেয়ে ভালো দিক হলো এর নান্দনিকতা। আপনি চাইলেই নিজের পছন্দমতো ছবি, আইকন বা কালার থিম দিয়ে পেজগুলো সাজাতে পারেন। পড়াশোনার একঘেয়েমি কাটাতে এই ছোট ছোট ভিজ্যুয়াল পরিবর্তনগুলো বেশ কাজে দেয়।
২. অবসিডিয়ান (Obsidian): চিন্তার জট খোলার মাধ্যম
নোশন যদি হয় সাজানো গোছানো ডায়েরি, তবে অবসিডিয়ান হলো আপনার মস্তিষ্কের ডিজিটাল রূপ। যারা প্রচুর রিসার্চ করেন বা যাদের অনেক ভিন্ন ভিন্ন টপিক নিয়ে পড়তে হয়, তাদের জন্য এটি চমৎকার। এটি আপনার নোটগুলোকে একে অপরের সাথে কানেক্ট বা যুক্ত করতে সাহায্য করে। ধরুন, আপনি ইতিহাসের কোনো ঘটনা নিয়ে পড়ছেন, সেটি হয়তো অর্থনীতির কোনো থিওরির সাথে মিলে যাচ্ছে—অবসিডিয়ানে আপনি এই দুই নোটের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে রাখতে পারেন।
২০২৬ সালের সেরা ফ্রি প্রোডাক্টিভিটি অ্যাপ এবং এআইয়ের ব্যবহার
প্রযুক্তি এখন এত দ্রুত এগোচ্ছে যে, সেরা ফ্রি এআই টুলস খুঁজে বের করা মাঝে মাঝে কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কিছু টুলস আছে যা আগামী কয়েক বছর ধরে শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে থাকবে।
৩. চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) বা এর বিকল্প
২০২৬ সালে এসেও জেনারেটিভ এআই শিক্ষার্থীদের বড় বন্ধু। তবে এর ব্যবহার হওয়া উচিত একজন স্মার্ট সহকারীর মতো। অ্যাসাইনমেন্ট পুরোটা লিখে না নিয়ে, বরং কোনো কঠিন টপিক সহজ ভাষায় বুঝে নিতে বা ব্রেইনস্টর্মিং করতে এটি ব্যবহার করুন। এটি আপনার চিন্তার পরিধি বাড়াতে সাহায্য করে।
৪. লেকচার নোট নেওয়ার সেরা এআই অ্যাপস: Otter.ai
ক্লাসে শিক্ষকের সব কথা খাতায় টুকে নেওয়া সবসময় সম্ভব হয় না। আবার শুধু শোনার দিকে মন দিলে নোট নেওয়া হয় না। এই সমস্যার সমাধানে Otter.ai খুব চমৎকার একটি অ্যাপ। এটি ক্লাসের লেকচার রেকর্ড করে এবং রিয়েল-টাইমে সেটিকে টেক্সটে রূপান্তর করে।
-
সুবিধা: আপনি পরে যেকোনো কিওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করে লেকচারের নির্দিষ্ট অংশ খুঁজে বের করতে পারবেন। এটি বিশেষ করে সেমিনার বা দীর্ঘ লেকচারের জন্য খুব উপকারী।
পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানোর সেরা অ্যাপ
আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ‘মনোযোগের অভাব’। সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন যখন বারবার আপনাকে ডাকতে থাকে, তখন পড়ার টেবিলে বসে থাকাটা যুদ্ধের মতো মনে হয়। এই যুদ্ধ জয়ে কিছু অ্যাপ আপনাকে সাহায্য করতে পারে।
৫. ফরেস্ট (Forest): ডিজিটাল ডিটক্স
ফরেস্ট অ্যাপটি আমার ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকার একদম উপরের দিকে। এর কনসেপ্টটা খুব সুন্দর এবং শান্ত। আপনি যখন পড়তে বসবেন, তখন অ্যাপটিতে একটি ভার্চুয়াল গাছের বীজ রোপণ করবেন। যতক্ষণ আপনি ফোনটি স্পর্শ না করবেন, ততক্ষণ গাছটি বড় হতে থাকবে। কিন্তু যদি আপনি অ্যাপ থেকে বেরিয়ে ফেসবুক বা ইন্সটাগ্রামে চলে যান, তবে গাছটি মারা যাবে।
দিন শেষে আপনার ফোনে একটি সুন্দর জঙ্গল তৈরি হবে, যা আপনার ফোকাস করা সময়ের প্রতীক। এটি আপনাকে ফোন থেকে দূরে থাকতে একটি পজিটিভ বা ইতিবাচক অনুপ্রেরণা দেয়।
৬. পড়ার সময় এবং অভ্যাস ট্র্যাক করার সেরা অ্যাপ: Habitica
পড়াশোনাকে যদি একটু খেলার ছলে নেওয়া যায়, কেমন হয়? হ্যাবিটিকা (Habitica) ঠিক এই কাজটিই করে। এটি একটি আরপিজি (RPG) গেমের মতো, যেখানে আপনার প্রাত্যহিক কাজগুলো সম্পন্ন করলে আপনি পয়েন্ট পাবেন এবং আপনার ক্যারেক্টার লেভেল আপ হবে। আর কাজ না করলে ক্যারেক্টারের হেলথ কমে যাবে। যারা গেম খেলতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য রুটিন মেনে চলা শেখার এটি একটি চমৎকার মাধ্যম।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য সময় ব্যবস্থাপনার অ্যাপ
বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে সময়ের হিসাব রাখাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ক্লাস, ল্যাব, টিউশনি, আড্ডা—সব সামলে নিজের জন্য সময় বের করা কঠিন।
৭. ছাত্রদের জন্য গুগল ক্যালেন্ডার ব্যবহারের টিউটোরিয়াল
গুগল ক্যালেন্ডার হয়তো খুবই সাধারণ একটি টুল, কিন্তু এর কার্যকারিতা অপরিসীম। এটি ব্যবহার করার জন্য খুব বেশি টেকনিক্যাল হওয়ার প্রয়োজন নেই।
-
টাইম ব্লকিং: আপনার দিনের পুরো সময়টাকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নিন। যেমন: সকাল ১০টা থেকে ১২টা ক্লাস, দুপুর ২টা থেকে ৪টা লাইব্রেরি ওয়ার্ক।
-
কালার কোডিং: পড়াশোনার জন্য নীল, ব্যক্তিগত কাজের জন্য সবুজ, আর সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য হলুদ রং ব্যবহার করতে পারেন। ক্যালেন্ডারের দিকে তাকালেই আপনি বুঝতে পারবেন আপনার দিনটা কীভাবে কাটবে। এটি মানসিকভাবে আপনাকে প্রস্তুত রাখতে সাহায্য করে।
৮. টিকটিক (TickTick): পেইড প্রোডাক্টিভিটি টুলের সেরা ফ্রি বিকল্প
অনেকেই টু-ডু লিস্ট বা চেকলিস্ট পছন্দ করেন। TickTick এর ফ্রি ভার্সনটি শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী। এতে ‘পোমোডোরো টাইমার’ বিল্ট-ইন থাকে, যা আপনাকে ২৫ মিনিট পড়া এবং ৫ মিনিট ব্রেকের নিয়ম মেনে চলতে সাহায্য করে। এর ইন্টারফেস খুব পরিষ্কার এবং মিনিমালিস্টিক, যা চোখের জন্য আরামদায়ক।
পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য স্টাডি প্ল্যানার অ্যাপ
পরীক্ষার আগের রাত মানেই একরাশ টেনশন। তবে আগে থেকে পরিকল্পনা থাকলে এই চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
৯. আনকি (Anki): স্মার্ট রিভিশন
ফ্ল্যাশাকার্ড পদ্ধতিতে পড়ার জন্য আনকি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিশেষ করে যারা মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন, বা যাদের প্রচুর তথ্য মনে রাখতে হয়, তাদের জন্য এটি খুব দরকারি। এটি ‘Spaced Repetition’ পদ্ধতি ব্যবহার করে। অর্থাৎ, আপনি যে তথ্যটি ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, অ্যাপটি সেটি আপনাকে বারবার মনে করিয়ে দেবে। আর যা আপনি ভালো পারেন, তা দেরিতে দেখাবে। এতে পড়ার সময় বাঁচে এবং মনে থাকে বেশিদিন।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ১০টি দরকারি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ: লোকাল কনটেক্সট
আন্তর্জাতিক অ্যাপগুলোর পাশাপাশি আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন এবং ইন্টারনেট গতির কথা মাথায় রেখে কিছু অ্যাপ খুব ভালো কাজ করছে।
১০. ক্যামস্ক্যানার (CamScanner) বা মাইক্রোসফট লেন্স
আমাদের দেশে বন্ধুদের খাতা থেকে নোট ফটোকপি করার প্রচলন খুব বেশি। কিন্তু এখন আর ফটোকপির দোকানে ভিড় করার প্রয়োজন নেই। ক্যামস্ক্যানার বা মাইক্রোসফট লেন্স দিয়ে আপনি যেকোনো হাতের লেখা নোটের ছবি তুলে সেটিকে পরিষ্কার পিডিএফ-এ রূপান্তর করতে পারেন। এটি পড়া এবং শেয়ার করা—দুটোই সহজ করে দেয়। ফোনের গ্যালারিতে অস্পষ্ট ছবির ভিড়ে নোট হারিয়ে ফেলার চেয়ে এটি অনেক বেশি গোছানো পদ্ধতি।
ডিজিটাল স্পেস সাজানোর কিছু শেষ কথা
এতগুলো অ্যাপের কথা শুনে হয়তো ভাবছেন, “সবগুলোই কি আমার লাগবে?” একদমই না। ঘর সাজানোর সময় যেমন আমরা সব আসবাবপত্র একসাথে কিনি না, বরং যেটা ঘরের সাথে মানানসই সেটাই বেছে নিই, অ্যাপের ক্ষেত্রেও তাই।
শুরুতে মাত্র একটি বা দুটি অ্যাপ বেছে নিন। হয়তো গুগল ক্যালেন্ডার দিয়ে সময়টা গুছিয়ে নিলেন, আর ফরেস্ট অ্যাপ দিয়ে মনোযোগ বাড়ালেন। কিছুদিন ব্যবহার করার পর যদি মনে হয় এগুলো আপনার জীবনের সাথে মানিয়ে যাচ্ছে, তবেই চালিয়ে যান। মনে রাখবেন, অ্যাপগুলো আপনার জীবন সহজ করার জন্য, আপনাকে আরও ব্যস্ত বা বিভ্রান্ত করার জন্য নয়।
প্রোডাক্টিভিটি মানে রোবটের মতো কাজ করা নয়, বরং নিজের জন্য, নিজের শখের জন্য এবং বিশ্রামের জন্য সময় বের করা। ২০২৬ সাল আপনার জন্য একটি গোছানো, সুন্দর এবং সফল বছর হোক—সেই কামনাই করি।
টিপস: সব অ্যাপ ফোনে ইন্সটল করে স্টোরেজ পূর্ণ করার দরকার নেই। প্রথমে নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনার পড়াশোনার কোন দিকটিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে? ফোকাস নাকি নোট নেওয়া? সেই অনুযায়ী অ্যাপ বেছে নিন।
আপনার জন্য পরবর্তী ধাপ: আজই আপনার ফোন থেকে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপগুলো সরিয়ে ফেলুন এবং এই তালিকা থেকে যেকোনো একটি অ্যাপ ডাউনলোড করে অন্তত তিন দিন ব্যবহার করে দেখুন। আপনার অভিজ্ঞতা কেমন হলো, চাইলে জানাতে পারেন!